ভিটামিন ‘ডি’র ঘাটতি পূরণে রোদে কখন কীভাবে থাকতে হবে

গরমের দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে ভিটামিন ‘ডি’ ঘাটতিজনিত সমস্যা বেড়েই চলেছে। এর কারণ কী? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিটামিন ডি  একটি স্টেরয়েড হরমোন, যা শরীরে প্রোটিন তৈরিতে নিয়ন্ত্রণকারীর ভূমিকায় থাকে এবং এর ঘাটতি হলে শিশু থেকে বয়স্ক সবারই নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। 

শরীরে এর ঘাটতি হলে শিশুদের রিকেট রোগ হয় অর্থাৎ পা বেঁকে যেতে পারে, মাথার খুলি বড় হয়ে যেতে পারে। বেশিদিন এই রোগে ভুগলে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধিও ব্যাহত হতে পারে। আবার বয়স্কদের ক্ষেত্রে হাড়ক্ষয় কিংবা ব্যথাসহ নানা সমস্যা তৈরি হয় ভিটামিন ডি-র অভাব থেকেই। একইসাথে বেড়ে যায় দৈহিক ওজন কিংবা প্রয়োজনীয় ওজন না হওয়ার সমস্যাও তৈরি হতে পারে।

এসব কারণেই এ ধরণের লক্ষণ দেখা দিলে রক্তে ভিটামিন ডি-র মাত্রা পরীক্ষার পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকরা। তবে বাংলাদেশে ঠিক কত মানুষ ভিটামিন ডি-র ঘাটতিতে ভুগছেন তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই।

 

ঢাকার মাতুয়াইল মা ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মাহমুদা হোসেন বলেছেন, শহরে প্রায় সবার মধ্যেই ভিটামিন-ডি’র ঘাটতিজনিত সমস্যা আছে।

তিনি বলেন, ‘এটি সত্যি, তেমন কোনো গবেষণা আমরা পাইনি। কিন্তু করোনার সময়কাল বিবেচনা করলেও অনুধাবন করা যায় যে, গ্রাম বা শহরে মাঠে-ঘাটে যারা কায়িক শ্রমের কাজ করে, তাদের মধ্যে এ সমস্যা কম। কারণ, তারা সরাসরি সূর্যের আলোর সংস্পর্শে থাকে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে বিশ্বের অন্তত ১০০ কোটি মানুষেরই ভিটামিন ডি’র ঘাটতি আছে এবং তারা এ সমস্যাকে গ্লোবাল হেলথ প্রবলেম বলে আখ্যায়িত করেছে।

আর এ সংকট মোকাবিলায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় সঠিক নিয়ম ও সময় দিয়ে সূর্যের আলোর সংস্পর্শে থাকা।

রোদের দেশেও কেন ভিটামিন ডি ঘাটতি?

ডা. মাহমুদা হোসেন বলেছেন, শহরে বাইরে বের হওয়ার প্রবণতা কমে যাচ্ছে, কিন্তু যারা বেরুচ্ছে তারাও পর্যাপ্ত সময় রোদে থাকে না কিংবা রোদে থাকলেও পোশাকের কারণে শরীর সরাসরি রোদ পাচ্ছে না।

তিনি বলেন, বিশেষ করে শহর এলাকাগুলোতেই বেশি হচ্ছে। কারণ, এখানে বাইরে খোলা জায়গা কম – যেখানে মানুষ সূর্যের আলোর সংস্পর্শে থাকতে পারে।

‘আবার যারা বেরুচ্ছে, তারা কিন্তু হয় যানবাহনে বা রোদে হাঁটলেও পোশাকে পরিপূর্ণ ঢাকা থাকছে।’

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যাবিষয়ক পরিচালক কাওসার আফসানা বলেছেন, ভিটামিন ডি সূর্যের আলো থেকে প্রয়োজনমতো পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে পোশাকটা সত্যিকার অর্থেই বড় একটি বাধা। কারণ, পুরো শরীর এমনকি হাত-পা পুরোটা ঢেকে বাইরে যায় ছেলে-মেয়ে সবাই। ফলে হাত ও পায়ে পর্যন্ত সূর্যের আলো লাগে না।

‘এ কারণে গ্রীষ্মপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে ভিটামিন ডি ঘাটতির প্রবণতা ব্যাপক। অন্যদিকে সূর্যালোকে পর্যাপ্ত সময় না থাকার পাশাপাশি বাংলাদেশে এর টেস্ট করার খরচটা বেশি হওয়ার কারণে, এটি পরীক্ষা করার প্রবণতা তুলনামূলক কম।’

তিনি বলেন, করোনার শুরুর দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কিন্তু সতর্ক করেছে যে, ভিটামিন ডি ঘাটতি যেন না হয়। কারণ, এই ঘাটতি আছে এমন কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে তার প্রভাব কিন্তু বেশি হবে।

রোদে কখন কীভাবে থাকতে হবে?

মাহমুদা হোসেন বলেছেন, সানলাইট বা সূর্যের আলো শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। সাধারণত সকাল ১০টার পর থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সময়টুকুতে সূর্যের আলোর সাথে যে রশ্মি আসে, সেটাই শরীরের জন্য বেশি উপকারী।

তিনি বলেন, শারীরিক সক্রিয়তা এবং সাথে সূর্যের আলো- এগুলো সুস্থতার জন্য অপরিহার্য।

কাওসার আফসানা বলেন, বাংলাদেশের মানুষের শরীরের গড় রং তুলনামূলক কালো, তাই সাদাদের তুলনায় এখানকার মানুষদের একটু বেশি সময় রোদে থাকতে হবে সূর্যের আলো থেকে পাওয়া ভিটামিন ‘ডি’ শরীরে যথাযথভাবে গ্রহণের জন্য।

‘এখানে বাচ্চাদের শরীর কিছুটা উন্মুক্ত রাখা কিংবা মাঠেঘাটে কৃষক শ্রমিকরা খালি গায়ে কাজ করেনন, তারা ভিটামিন ডি বেশি পেয়ে থাকেন। শহরে সেভাবে সম্ভব না হলেও অন্তত হাত ও পায়ে যেন সূর্যের আলো লাগে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’

সূর্যই কি ভিটামিন ডির একমাত্র উৎস?

সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ভিটামিন ডির অন্যতম উৎস। সূর্য যখন প্রখর থাকে, তখনই অতিবেগুনি রশ্মি পৃথিবীতে পৌঁছায়। কিন্তু এর বাইরে দুধ, কুসুমসহ ডিম এবং চর্বিযুক্ত খাদ্যে ভিটামিন ডি থাকে।

মাহমুদা হোসেন বলেছেন, এর বাইরে কারও ভিটামিন ডি দরকার হলে প্রয়োজনে চিকিৎসক সাপ্লিমেন্টারি ওষুধ দিতে পারেন। তিনি বলেন, বয়স্কদের ক্ষেত্রে সমস্যা অনেক বেশি, তাই বয়স্কদেরও রোদে যাওয়া উচিত ভিটামিন ডি পাওয়ার জন্য।

ড. কাওসার আফসানা বলেছেন, সঠিক নিয়মে সূর্যের আলোতে থাকলে এবং ভিটামিন-ডি সমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত খেলে এ সমস্যা থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব। 

তবে কাচের জানালার ভেতরে থেকে রোদ উপভোগ করলে ভিটামিন ডি পাওয়া যায় না এবং যারা বাইরে সানস্ক্রিন ব্যবহার করেন – তারাও সানস্ক্রিনের কারণে রোদ থেকে ভিটামিন ডি নিতে পারেন না।

এসব কারণে সানস্ক্রিন ছাড়াই রোদে বের হওয়া এবং রোদে থাকার সময় অন্তত হাত পা ও মুখমণ্ডল উন্মুক্ত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন কাওসার আফসানা ও মাহমুদা হোসেন।

যদিও শুধু খাবার থেকে যথেষ্ট পরিমাণ ভিটামিন ডি পাওয়া একটু কঠিন হতে পারে। তবে মাছ, ডিম, দইয়ের মতো খাবারে পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন ডি রয়েছে।

ভিটামিন ডি কেন প্রয়োজন?

সুস্থ হাড়, দাঁত এবং পেশির জন্য ভিটামিন ‘ডি’র প্রয়োজন সেকথা আমরা অনেকেই জানি। আমরা জানি ভিটামিন ডি’র অভাবে হাড় ঠিকমতো গড়ে ওঠে না এবং শিশুরা রিকেট নামে রোগের শিকার হতে পারে এবং প্রাপ্তবয়স্করা অস্টিওম্যালাসিয়া নামে দুর্বল হাড়ের রোগে ভুগতে পারেন।

কিন্তু এখন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিটামিন ডি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাহায্য করে।

কোনো কোনো গবেষণা বলছে, শরীরে পর্যাপ্ত মাত্রার ভিটামিন ডি থাকলে তা সাধারণ সর্দিজ্বর এবং ফ্লু-তেও সাহায্য করে। তবে তারা একথাও বলছেন, এই গবেষণার তথ্যপ্রমাণ সবক্ষেত্রে একরকম নয়। কিছু রকমফেরও আছে।

ব্রিটেনের পুষ্টিবিষয়ক বিজ্ঞান গবেষণা উপদেষ্টা কমিটি এখন একটি গবেষণা চালাচ্ছে, যাতে দেখা হচ্ছে সংক্রমণজনিত বক্ষব্যাধিতে ভিটামিন ডি ঠিক কীভাবে কাজ করে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *